প্রেস বিজ্ঞপ্তি :
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টায় ২নং রেলগেটস্থ বাসদ মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক প্রদীপ সরকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিখিল দাস। আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা ভবানী শংকর রায়, বাসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা সদস্য সচিব আবু নাঈম খান বিপ্লব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মনি সুপান্থ এবং চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য সেলিম আলাদিন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব জামাল হোসেন।
আলোচকবৃন্দ বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু প্রেম ও বিদ্রোহের কবি নন; তিনি ছিলেন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য, শোষণ, নিপীড়ন এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কবি। তাঁর সাহিত্য ও জীবনচর্চার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা। তিনি একটি বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াকেই তিনি সর্বোচ্চ মর্যাদা হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁর এই আদর্শ আজও মানুষের জীবন ও সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামে প্রেরণা জোগায়।
আলোচকবৃন্দ বলেন, চরম দারিদ্র্যের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা নজরুল ব্রিটিশ-পরিচালিত ৪৯ নম্বর বেঙ্গলি রেজিমেন্টে সৈনিক হিসেবে যোগ দেন। করাচি সেনানিবাসে অবস্থানকালে অবসর সময়ে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। পরবর্তীতে কমরেড মুজাফ্ফর আহমদের সাহচর্য তাঁর চিন্তা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন মাত্রা যোগ করে। শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতা ও গানে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর **‘সাম্যের গান’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘শ্রমিকের গান’, ‘লাল পতাকার গান’, ‘ধীবরের গান’**সহ বিভিন্ন রচনায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও শ্রেণিচেতনার প্রকাশ ঘটেছে। ১৯২৭ সালে মে দিবস উপলক্ষে নজরুল শ্রমজীবী মানুষের আন্তর্জাতিক সংগীত ‘ইন্টারন্যাশনাল’-এর বঙ্গানুবাদ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে মার্ক্সীয় চিন্তা ও সাম্যবাদী চেতনার প্রভাব সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বক্তারা আরও বলেন, নজরুল ছিলেন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী চেতনার অন্যতম প্রধান কবি। ধর্ম, জাত, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে হিন্দু-মুসলমানের পরিচয়ের চেয়ে বড় ছিল মানুষের পরিচয়।
নজরুলের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে বক্তারা বলেন—
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ঐ জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারি! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র।
নজরুল তাঁর নিজের বক্তব্যেও হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কথা বলেছেন। তাঁর ভাষায়, তিনি হিন্দু-মুসলিমকে এক জায়গায় এনে হাত মেলানোর এবং গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছেন। এ থেকেই তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী অবস্থান স্পষ্ট হয়।
বক্তারা বলেন, নজরুলের কলম সবসময় শোষিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিল। সমাজের কুলি-মজুর ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর নিপীড়নের চিত্র তিনি অত্যন্ত তীব্রভাবে তাঁর কবিতায় তুলে ধরেছেন। ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—
“এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল!”
এই উচ্চারণ নিছক সাহিত্যিক আবেগ নয়; এটি শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে একজন কবির প্রতিবাদী অবস্থান।
আলোচকবৃন্দ বলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নজরুলের কলম ছিল নির্ভীক। তাঁর ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতার উচ্চারণ—
“তোরা সব জয়ধ্বনি কর!
তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বৈশাখীর ঝড়।”
তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে, মানুষের মুক্তির পক্ষে। তাই নজরুলকে কোনো ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের সংকীর্ণতায় আবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন মানুষের কবি, সাম্যের কবি, বিদ্রোহের কবি এবং অসাম্প্রদায়িক মানবতার কবি।
আলোচকবৃন্দ বলেন , নজরুলের সময়ের তুলনায় সমাজের অনেক পরিবর্তন ঘটলেও শোষণ, বৈষম্য, দারিদ্র্য, সাম্প্রদায়িকতা ও নিপীড়নের নানা রূপ এখনো বিদ্যমান। ফলে নজরুলের সাম্যবাদী, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী চিন্তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর সাহিত্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, শোষিত মানুষের পাশে থাকতে এবং ধর্ম-বর্ণ-জাতিগত বিভেদ অতিক্রম করে মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে আমাদের অনুপ্রাণিত করে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবসে তাঁর সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে শোষণ-বৈষম্যহীন, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও মুক্তির সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।
আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের শিল্পীরা নজরুলের কবিতা, গান ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থাপন করেন।
আপনার মতামত লিখুন :