তাজা খবরথানার সংবাদনারায়ানগঞ্জ সদর থানামহানগরশীর্ষ সংবাদসম্পাদকের পছন্দ

নারায়ণগঞ্জে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ ও অসাধু ডাক্তারদের দৌরাত্ম্য”

খবর নারায়ণগঞ্জ.কম: নারায়ণগঞ্জের সরকারি খানপুর ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি ভিক্টোরিয়া হাসপাতাল এবং শহরের বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক ও ফার্মেসির সামনে একটি নৈতিকতাবিহীন প্রথা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে, যা সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। ঔষধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অবৈধ কার্যকলাপ এবং কিছু নীতি-নৈতিকতাহীন অসাধু ডাক্তারদের সহযোগিতা এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করছে। এই দৌরাত্ম্য শুধু রোগীদের জন্য কষ্টদায়ক নয়, বরং চিকিৎসকদের পেশাগত নৈতিকতা ও স্বাস্থ্যসেবার মানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই অবস্থার অবসান এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের জরুরি দাবি।

হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অবাধ বিচরণ এবং তাদের আগ্রাসী আচরণ রোগীদের জন্য অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ডাক্তারদের চেম্বারের বাইরে তারা সারাক্ষণ অপেক্ষা করে, এমনকি অনেক সময় চেম্বারের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের কোম্পানির ঔষধ প্রেসক্রাইব করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। দুঃখজনকভাবে, কিছু অসাধু ডাক্তার এই কোম্পানিগুলোর সাথে গোপন চুক্তিতে জড়িয়ে তাদের নির্দেশিত ঔষধ প্রেসক্রাইব করেন, যা রোগীদের স্বাস্থ্যের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। এই প্রক্রিয়ায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত সময় কমে যায়, ডাক্তারদের মনোযোগ বিঘ্ন ঘটে, এবং অপেক্ষমান রোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে কষ্ট পান। এই অমানবিক আচরণ স্বাস্থ্যসেবার মানকে হ্রাস করে এবং চিকিৎসক-রোগীর বিশ্বাসের সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এই সমস্যা শুধু হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শহরের কালিরবাজার, চাষাঢ়া, মিশন পাড়া, ডিআইটি এলাকার বড় বড় ফার্মেসিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা ঔষধ কিনতে আসা রোগীদের প্রেসক্রিপশন চেক করে, তাদের কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ অসাধু ডাক্তাররা তাদের নির্দেশিত ঔষধ লিখছেন কিনা তা যাচাই করে। এই প্রক্রিয়ায় রোগীদের গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে, যা একটি গুরুতর নৈতিক অপরাধ। আরও উদ্বেগজনক বিষয়, প্রেসক্রিপশন চেক করার সময় রিপ্রেজেন্টেটিভদের সাথে রোগী বা তাদের স্বজনদের বাকবিতণ্ডা, এমনকি হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে। এই ধরনের ঘটনা স্বাস্থ্য ও সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং এতে

সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করছে।
এই অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের এই আগ্রাসী কার্যকলাপ এবং অসাধু ডাক্তারদের সহযোগিতা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করছে। এই চুক্তির ফলে রোগীদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দামি বা অপ্রয়োজনীয় ঔষধ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক ও শারীরিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে। এই প্রথা স্বাস্থ্যসেবা খাতে গভীর নৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে।
এই অবস্থার অবসানে সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চেম্বারে অবাধ প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে। তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঔষধ কোম্পানির সাথে অবৈধ চুক্তিতে জড়িত অসাধু ডাক্তারদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, যেমন পেশাগত লাইসেন্স বাতিল, আরোপ করতে হবে। তৃতীয়ত, রোগীদের প্রেসক্রিপশনের গোপনীয়তা রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এছাড়া, সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি ও অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে এই নৈতিকতাবিহীন কার্যকলাপের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে একযোগে কাজ করতে হবে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। এখনই সময় এই অসাধু ডাক্তার ও রিপ্রেজেন্টেটিভদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে স্বাস্থ্যসেবাকে রোগীকেন্দ্রিক ও স্বচ্ছ করার। কঠোর নীতিমালা ও শাস্তির মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা না করা হলে, স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ আরও গভীর হবে।

Related Articles

Back to top button