আশুলিয়ায় নিহত ৮, পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের পুনর্বাসন দাবি


Jahid প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ৯:৩৩ অপরাহ্ন / ০ Views
আশুলিয়ায় নিহত ৮, পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও আহতদের পুনর্বাসন দাবি
প্রেস বিজ্ঞপ্তি:
রানা প্লাজা, তাজরীন ও সেজান জুসসহ শিল্পদুর্ঘটনার বিচারহীনতা বন্ধ করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের বিবৃতি আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডারবাহী কাভার্ডভ্যান থেকে সিলিন্ডার নামানোর সময় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে ৮ জনের প্রাণহানি এবং আরও কয়েকজনের আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি সেলিম মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম শরীফ আজ  ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সোমবার সংবাদপত্রে পাঠানো এক বিবৃতি দেয়।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। বারবার ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনা ঘটলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ীদের বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত না হওয়ায় একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন, চিকিৎসা এবং যুক্তিসঙ্গত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। ২০ অনুচ্ছেদে কর্মকে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত হয়েছে। সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে শ্রমজীবী জনগণকে শোষণ থেকে মুক্ত করার বিষয়টিও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
নেতৃবৃন্দ বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ এবং ২০২৬ সালের সংশোধনীর আলোকে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, দুর্ঘটনা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ এবং দুর্ঘটনাজনিত জখমের জন্য ক্ষতিপূরণের বিধান রয়েছে। শ্রম আইনের ৮০ ধারায় জীবনহানি, শারীরিক আঘাত, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষকে দ্রুত লিখিত বা ডিজিটাল নোটিশ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ১৫০ ধারায় চাকরির সময় ও চাকরি থেকে উদ্ভূত দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য মালিকের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণসহ শ্রমিকের আইনগত সুরক্ষার বিভিন্ন বিধানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশেষ করে আইনভঙ্গের ক্ষেত্রে শ্রমিককে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ এবং তা বাস্তবায়িত না হলে শ্রম আদালতে যাওয়ার সুযোগের বিধান সংশোধিত আইনে রয়েছে।
আইএলও কনভেনশন ১২১-এর আলোকে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার Employment Injury Benefits Convention, 1964 (ILO Convention No. 121) কর্মক্ষেত্রের দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসা সুবিধা এবং নগদ সুবিধাসহ সামাজিক সুরক্ষার নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। কনভেনশনের ৯ অনুচ্ছেদে কর্মক্ষেত্রজনিত আঘাতের ক্ষেত্রে চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট সুবিধা এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নগদ সুবিধা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশ বর্তমানে ILO Convention No. 121-এর ratifying country নয়—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা বলছি, বাংলাদেশের জাতীয় আইনকে আন্তর্জাতিক শ্রমমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুবরণকারী শ্রমিকের পরিবার এবং স্থায়ীভাবে আহত শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা ও ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রানা প্লাজা থেকে তাজরীন—বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ করতে হবে
নেতৃবৃন্দ বলেন, রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পরও সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর বিচার চূড়ান্তভাবে শেষ হয়নি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসে ১,১৩৬ জন নিহত এবং প্রায় ১,৫০০ জন আহত হন। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার তখনও চলমান ছিল। হত্যা মামলায় ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে প্রায় ১৫০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছিল বলে প্রসিকিউশন জানিয়েছে।
২০১২ সালের তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জন শ্রমিক নিহত হন। বহু বছর পরও মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকার এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণ ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার না পাওয়ার বিষয়টি বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একইভাবে, ২০২১ সালের সেজান জুস/হাশেম ফুডস কারখানা অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনায় হত্যা ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করা হয় এবং হাইকোর্ট ক্ষতিপূরণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও তদন্তের বিষয়ে রুল জারি করেন।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট মনে করে, শিল্পদুর্ঘটনায় শ্রমিকের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; প্রতিটি প্রাণহানির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় তদারকি, মালিকের দায়িত্ব, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের প্রশ্ন জড়িত। অতীতের দুর্ঘটনার বিচার ও দায় নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা নতুন দুর্ঘটনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করে।
আমাদের দাবি
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের পক্ষ থেকে আমরা অবিলম্বে—
১. আশুলিয়ার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা নিরপেক্ষ, উচ্চপর্যায়ের ও সময়বদ্ধ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন করতে হবে।
২. নিহত প্রত্যেক শ্রমিক ও ব্যক্তির পরিবারকে আইনানুগ, পর্যাপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
৩. নিহতদের পরিবারকে শুধু এককালীন অনুদান নয়, উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানোর কারণে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পুনর্বাসন সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. আহতদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষকে বহন করতে হবে এবং স্থায়ীভাবে আহতদের আজীবন আয়ের সমপর্যায়ের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
৫. দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিক, ব্যবস্থাপনা, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বা অন্য যে কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে দ্রুত বিচার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
৬. গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন, সংরক্ষণ, খালাস ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন ও নিরাপত্তাবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
৭. প্রত্যেক শিল্পকারখানায় অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, শ্রমিক প্রশিক্ষণ এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে।
৮. রানা প্লাজা, তাজরীন ফ্যাশনস, সেজান জুসসহ অতীতের ভয়াবহ শিল্পদুর্ঘটনার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
৯. শিল্পদুর্ঘটনায় নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের জন্য স্থায়ী জাতীয় শ্রমিক দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
১০. কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের জীবন ও নিরাপত্তাকে উৎপাদন ও মুনাফার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে এবং শ্রম আইন, অগ্নিনিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ বলেন, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই সস্তা নয়। কর্মক্ষেত্রে একজন শ্রমিকের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারানো নয়—এটি রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতারও প্রশ্ন। অতীতের দুর্ঘটনার বিচার ও দায় নির্ধারণ না হলে ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা বন্ধ করা কঠিন হবে।
আশুলিয়ার ঘটনার দ্রুত তদন্ত, নিহতদের পরিবার ও আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট দেশবাসী ও শ্রমিকসমাজের প্রতি ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।