প্রেস বিজ্ঞপ্তি:
ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইকের সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নসহ ১০ দফা দাবিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি
নারায়ণগঞ্জ, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার:
রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, মিশুক ও সমজাতীয় যানবাহনের জন্য সমন্বিত নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন, নিবন্ধন ও চালকদের লাইসেন্স প্রদান, প্রশিক্ষণ, রুট পারমিট, নিরাপদ ডিজাইন, পৃথক লেন ও সার্ভিস রোড নির্মাণসহ ১০ দফা দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে ব্যাটারিচালিত যানবাহন উচ্ছেদ বা নিষিদ্ধ না করে বাস্তবতার আলোকে একটি সমন্বিত ও টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে এর বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন রিকশা, ব্যাটারি রিকশা-ভ্যান ও ইজিবাইক সংগ্রাম পরিষদের জেলা সংগঠক এস এম কাদির, হাসনাত কবির, দাউদ আলী মামুনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ রিকশা, ব্যাটারি রিকশা, ভ্যান ও ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। রোদ-বৃষ্টি, গরম-শীত উপেক্ষা করে এসব যানবাহনের চালকরা প্রতিদিন মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। স্বল্প আয়ের মানুষের সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এসব যানবাহন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় উদ্যোগে গড়ে ওঠা ব্যাটারিচালিত যানবাহন খাতের সঙ্গে চালক, মালিক, গ্যারেজ মালিক, চার্জিং ব্যবসায়ী, মেকানিক, যন্ত্রাংশ উৎপাদক ও ব্যবসায়ীসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে এই খাতকে হঠাৎ বন্ধ বা উচ্ছেদ করার যেকোনো উদ্যোগ লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেবে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংগ্রাম পরিষদ জানায়, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনের নিবন্ধন, নিরাপদ ডিজাইন এবং সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছে। তাদের দাবি, যানবাহন উচ্ছেদ বা নিষিদ্ধ না করে কারিগরি ত্রুটি সংশোধন, আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই খাতকে একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত করতে হবে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, ‘ইলেকট্রিক মোটরযান রেজিস্ট্রেশন ও চলাচল সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৩’ অনুমোদিত হলেও ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ও সমজাতীয় মোটরযানের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রস্তাবিত নীতিমালা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে নীতিমালা ঝুলে থাকার কারণে চালক ও মালিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং সড়কে বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের ফিটনেস যাচাই, নিরাপদ কাঠামো নির্ধারণ, যানবাহনের নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, ট্রাফিক পুলিশ, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ এবং চালক-মালিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ বা সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানানো হয়।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, কোনো বিশেষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের স্বার্থে এমন কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করা যাবে না, যার ফলে স্থানীয় উৎপাদক, চালক ও সাধারণ মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বর্তমানে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক, মিশুকসহ সমজাতীয় যানবাহনকে সরকারি অনুমোদিত নিরাপদ ডিজাইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সরকারি সহায়তা দিতে হবে।
তারা বলেন, পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া যেতে পারে; তবে এর ব্যয়ভার সরাসরি দরিদ্র চালক ও শ্রমিকের ওপর চাপানো যাবে না। এজন্য সরকারি ভর্তুকি, সহজ ঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একইভাবে চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলে বিদ্যুৎ চুরি ও অপচয় বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
স্মারকলিপিতে উত্থাপিত ১০ দফা দাবি হলো—
১. সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো, যানজট নিরসন এবং গাড়ি, চালক ও যাত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার ও বিআরটিএর সমন্বয়ে একটি সমন্বিত নীতিমালা ও বিধিমালা প্রণয়ন করে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের নিবন্ধন, চালকদের লাইসেন্স ও রুট পারমিট প্রদান করতে হবে।
২. নীতিমালার নামে ব্যাটারিচালিত যানবাহন প্রস্তুতকারক বা বিপণনকারী কোনো একক কোম্পানি কিংবা ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না। বর্তমান স্থানীয় ব্যাটারি রিকশা ও ইজিবাইক উৎপাদকদের সরকারি অনুমোদিত নিরাপদ ই-রিকশার ডিজাইন অনুযায়ী উৎপাদনের সুযোগ দিয়ে দেশীয় অটোমোবাইল শিল্পকে রক্ষা ও বিকশিত করতে হবে।
৩. কারিগরি ত্রুটি সংশোধন এবং অনুমোদিত ডিজাইন অনুযায়ী বর্তমানে চলাচলরত ব্যাটারিচালিত যানবাহনের আধুনিকায়ন বা প্রতিস্থাপনের জন্য সরকারি ভর্তুকি ও কমপক্ষে দুই বছর সময় দিতে হবে। চালক, মেকানিক, মালিকসহ সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় ব্যাটারিচালিত যানবাহন বন্ধ বা নিষিদ্ধ করার যেকোনো উদ্যোগ বন্ধ করতে হবে।
৪. দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের জন্য পার্কিং ও চার্জিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি ও সহজলভ্যতার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে চার্জ দেওয়ার বাধ্যতামূলক শর্ত প্রত্যাহার করতে হবে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের ব্যয় দরিদ্র রিকশা শ্রমিক ও চালকদের ওপর চাপানো যাবে না।
৬. মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে স্বল্পগতির ও লোকাল যানবাহনের জন্য পৃথক লেন অথবা সার্ভিস রোড নির্মাণ করতে হবে।
৭. ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কাছ থেকে অবৈধ চাঁদাবাজি, বিট-বাণিজ্য, ব্যাটারি ও রিকশা ছিনতাই-চুরি এবং চালকদের হয়রানি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে নারী চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৮. ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চালকসহ নিহত ও আহত সকল শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব ডা. মনীষা চক্রবর্তী, কেন্দ্রীয় সাবেক সদস্য সচিব প্রকৌশলী ইমরান হাবিব রুমন, সিলেট মহানগর উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আবু জাফর, সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি প্রণব জ্যোতি পাল, জেলা সাধারণ সম্পাদক মঞ্জু হোসেন, চট্টগ্রাম জেলা আহ্বায়ক ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী সদস্য আল কাদেরী জয়, ঢাকা মহানগর শাখার উপদেষ্টা এস এম কাদির, ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি জালাল আহমেদ, যুগ্ম সম্পাদক দাউদ আলী মামুনসহ সারাদেশে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের নামে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও পুলিশি হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
১০. সকল শ্রমিকের জন্য সেনাবাহিনী ও পুলিশের ন্যায় রেশন, পেনশন, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য কার্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ বলেন, “উচ্ছেদ নয়, আমরা চাই নীতিমালা, নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন। ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের স্বার্থে নয়, চালক-শ্রমিকের জীবন-জীবিকা রক্ষার স্বার্থে ব্যাটারিচালিত যানবাহন খাতকে পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল করার উদ্যোগ নিতে হবে।”
তারা আরও বলেন, দেশের বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকটের সময়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত একটি খাতকে ধ্বংস না করে আধুনিকায়ন ও নিয়মের আওতায় আনাই হবে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। তাই সকল অংশীজনের মতামত নিয়ে দ্রুত একটি কার্যকর, গণমুখী ও টেকসই নীতিমালা-বিধিমালা চূড়ান্ত করে তা বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন, সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক, চালক, মালিক, মেকানিক ও স্থানীয় উৎপাদকদের জীবন-জীবিকা রক্ষার পাশাপাশি সড়কে শৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
উচ্ছেদ নয়—সমন্বিত নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ চাই।
চালক-শ্রমিকের জীবন-জীবিকার নিশ্চয়তা চাই।
আপনার মতামত লিখুন :