রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে চারণের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান


Jahid প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১০, ২০২৬, ৯:৩২ অপরাহ্ন /
রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে চারণের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
প্রেস বিজ্ঞপ্তি: রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবসে চারণের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
নারায়ণগঞ্জ, ১০ আগস্ট ২০২৬: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, “সংস্কৃতি শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; সংস্কৃতি মানুষের চিন্তা, চেতনা ও মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম শক্তি। শোষণ-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ করতে সংস্কৃতিকে সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।”
বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথকে কেবল কবি, সাহিত্যিক ও সংগীতস্রষ্টা হিসেবে স্মরণ করলে তাঁর প্রতি যথাযথ সম্মান দেখানো হবে না। তাঁর সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজচিন্তার মধ্যকার মানবতাবাদ, মুক্তবুদ্ধি, অসাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানুষের মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে আজকের সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।
রবীন্দ্রনাথের “মনুষ্যত্বের শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তই তার অধীন”—এই উপলব্ধির কথা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কিংবা জীবিকার জন্য দক্ষতা অর্জনের বিষয় নয়; প্রকৃত শিক্ষা মানুষের বিবেক, যুক্তিবোধ, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বিকশিত করে। যে শিক্ষা মানুষকে অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায় না, সেই শিক্ষার সামাজিক উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যায়।
বক্তারা আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিছক সৌন্দর্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। **‘গোরা’, ‘ঘরে-বাইরে’, ‘রক্তকরবী’, ‘গল্পগুচ্ছ’**সহ তাঁর বহু সৃষ্টিতে সমাজ, মানুষ, ক্ষমতা, শোষণ, পরিচয়, স্বাধীনতা ও মুক্তির প্রশ্ন উঠে এসেছে। তাঁর সাহিত্য মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেছে এবং সংকীর্ণতা, অন্ধত্ব ও বিভাজনের বিরুদ্ধে মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে।
তাঁরা বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা এবং ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ তাঁর ঔপনিবেশিক নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তাঁর দেশভাবনা সংকীর্ণ জাত্যাভিমাননির্ভর ছিল না; বরং মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও বিশ্বমানবতার আদর্শ ছিল তাঁর চিন্তার অন্যতম ভিত্তি।
বক্তারা বলেন, আজকের বাংলাদেশে যখন শ্রমজীবী মানুষের অধিকারহীনতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, কুসংস্কার ও সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতা সমাজে নানা সংকট তৈরি করছে, তখন গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়োজন আরও বেড়েছে। শ্রমিক-কৃষক-সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে সংস্কৃতির বিষয়বস্তুতে পরিণত করতে হবে। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, আবৃত্তি, পথনাটক ও গণসংগীতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে মুক্তচিন্তা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও অধিকারচেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে।
চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নেতৃবৃন্দ বলেন, সংস্কৃতিকে বাজার ও মুনাফার পণ্যে পরিণত করার প্রবণতার বিরুদ্ধে গণমানুষের সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।
তাঁরা বলেন—
“আমরা এমন সংস্কৃতি চাই, যে সংস্কৃতি মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে; সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করবে; কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলবে এবং শোষণ-বৈষম্যহীন মানবিক সমাজ নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক প্রদীপ সরকার এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব জামাল হোসেন।
প্রধান আলোচক ছিলেন চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কামরুজ্জামান ভূইয়া।
আলোচনা করেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সহসভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, প্রগতি লেখক সংঘের সদস্য বিমল কান্তি দাস, সাংস্কৃতিক কর্মী জহিরুল ইসলাম মিন্টু, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম নারায়ণগঞ্জ জেলা সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আক্তার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সদস্য বেলাল হোসাইন প্রমুখ।
বক্তারা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও মানবতাবাদী চেতনাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শোষণ-বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা, কুসংস্কার ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রত্যয়
সংস্কৃতি হোক সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার।
মনুষ্যত্ব হোক শিক্ষার মূল ভিত্তি। সাম্প্রদায়িকতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠুক।
শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংগ্রাম সংস্কৃতির কেন্দ্রে স্থান পাক। শোষণ-বৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এগিয়ে চলুক। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।