
গেজেটে নাম, ১১ বছর পেয়েছেন সম্মানী
আদালতের নথি অনুযায়ী, সাহাবুদ্দিনের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের পক্ষে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের সনদ ও প্রত্যয়নপত্র ছিল। ২০০৫ সালের ২৯ মে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও তাঁর নাম প্রকাশিত হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এসব নথির ভিত্তিতে ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সম্মানী পান তিনি। পরে ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির বিভক্ত সিদ্ধান্তের পর তাঁর সম্মানী বন্ধ হয়ে যায়। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, কমিটির ছয় সদস্য তাঁর পক্ষে মত দিয়েছিলেন, বিপরীতে একজন সদস্য নেতিবাচক মত দেন। ওই নেতিবাচক মতামতে স্বাক্ষর না থাকার বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) কাছে আপিল করেন সাহাবুদ্দিন। তাঁর আপিল খারিজ করে আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।
হাইকোর্টের রায়, তবু বাস্তবায়ন হয়নি
মামলার রায়ের বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল জারি করা সম্পূরক রুল মঞ্জুর করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই আপিল খারিজসংক্রান্ত চিঠি এবং ২০২১ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির বিভক্ত সিদ্ধান্ত বহাল রাখার পদক্ষেপকে আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও আইনগত কার্যকারিতাহীন ঘোষণা করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইন অনুযায়ী সাহাবুদ্দিনকে মাসিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে রায়ের বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
তবে পরিবারের অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ কার্যকর হয়নি। এ বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আতাউল-আল ওসমান বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখনো রায় বাস্তবায়ন করেনি। তাঁর দাবি, আপিলের সুযোগ পেরিয়ে যাওয়ায় রায় বাস্তবায়ন করা ছাড়া অন্য পথ নেই। নির্দেশ কার্যকর না করার বিষয়টি আদালত অবমাননার প্রশ্নও তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
রায়ের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের নথি যাচাই ছাড়া বকেয়া সম্মানীর পরিমাণ বা পরিশোধের সময়সীমা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে মামলাটিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ সাহাবুদ্দিনের পরিবারের দাবিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে জনপ্রতিনিধি, নারীশিক্ষার প্রসারেও অবদান।
প্রকাশিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪২ সালে জন্ম নেওয়া সাহাবুদ্দিন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার কাশীপুর মধ্যপাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর তিনি স্থানীয় জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৮৮ সালে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এলাকার মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কাশীপুর আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়। স্থানীয় সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করা, জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের পাশে থাকা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সাহাবুদ্দিনের জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। অথচ শেষ বয়সে নিজের স্বীকৃতি ও সম্মান ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁকে আইনি লড়াই চালাতে হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের দাবি এখন আরও স্পষ্ট—ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠেছে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা।
যে মানুষ স্বাধীন দেশের জন্য অস্ত্র ধরেছিলেন, তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিয়ে এই বিরোধ পরিবারের জন্য গভীর বেদনার। সাহাবুদ্দিন আর নেই; কিন্তু তাঁর পরিবারের প্রশ্ন রয়ে গেছে—আদালতের রায়ের পরও কেন ফিরল না সেই সম্মান, যার জন্য জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁকে?